শনিবার, ১৬ মে ২০২৬, ০৯:৪৯ পূর্বাহ্ন

শি জিনপিংয়ের প্রশংসায় ট্রাম্প, তবে প্রাপ্তির খাতা শূন্যই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকা ॥
ব্যর্থ ইরান কূটনীতি, মুখ থুবড়ে পড়ল বোয়িংয়ের শেয়ার; বাণিজ্যযুদ্ধে কেবলই ‘ভঙ্গুর’ স্থিতিশীলতা। তিন দিনের চীন সফর শেষে গতকাল বেইজিং ত্যাগ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০১৭ সালের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই হাই-প্রোফাইল চীন সফরকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সফরের শুরু থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিত্ব ও আতিথেয়তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকলেও, বেশির ভাগ পর্যবেক্ষক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের বাস্তব অর্জন ‘যৎসামান্যই’। ফলে ট্রাম্পের এই বহুল আলোচিত সফর শেষ পর্যন্ত ‘যত গর্জে তত বর্ষে না’-প্রবাদের মতোই রূপ নিয়েছে।

মেগা ডিলের আশায় গুড়ে বালি
রাজনৈতিকভাবে ওয়াশিংটনের প্রধান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বেইজিং। দেশের মাটিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিজের ক্ষয়িষ্ণু জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার করতে এই বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিক এক বড় সাফল্য আশা করেছিলেন ট্রাম্প। এ কারণে পুরো সফরে তিনি নিজেকে অস্বাভাবিকভাবে সংযত রাখেন। অ্যাপল, এনভিডিয়া, বোয়িং, অ্যাক্সনমবিল, সিটিগ্রুপ, টেসলা ও মেটার মতো বিশ্বখ্যাত মার্কিন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা ট্রাম্পের সফরসঙ্গী হওয়ায় হোয়াইট হাউজ ইঙ্গিত দিয়েছিল, এটি ‘চীনকে আরও উন্মুক্ত করার’ একটি বড় সুযোগ। কিন্তু সফর শেষে দেখা গেল- প্রত্যাশিত কোনো মেগা বাণিজ্যচুক্তি হয়নি, নতুন শুল্ক সমঝোতা আসেনি এবং প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়েও কোনো অগ্রগতি হয়নি। এমনকি দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কাঠামোগত বিরোধের কোনো দৃশ্যমান সমাধান মেলেনি। চীনের অর্থনৈতিক ধীরগতির সুযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সুবিধা পাওয়ার যে আশা করেছিল, বেইজিংয়ের চরম সতর্ক অবস্থানের কারণে তা অধরাই রয়ে গেছে। রয়টার্সের বরাতে বিশ্লেষকেরা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ইরান ও বোয়িং সংকটে মেলেনি সমাধান
সফরের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল ইরান সংকট। মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার তেহরানের ওপর চীন যেন প্রভাব খাটিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে- এমনটাই চেয়েছিল ওয়াশিংটন। চীন একদিকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা চায়, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কও চটাতে রাজি নয়। ফলে বেইজিং এ বিষয়ে খুবই সীমিত সহযোগিতার কথা জানিয়েছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিসিয়া কিম স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান নিয়ে চীনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি আসেনি।’

ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও ধাক্কা খেয়েছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্প চীন কর্তৃক ২০০টি বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে সমঝোতার দাবি করলেও, বাজারের প্রত্যাশিত প্রায় ৫০০ বিমানের তুলনায় তা ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। ফলে পুঁজিবাজারে বোয়িংয়ের শেয়ারের দর ৪ শতাংশের বেশি পতন ঘটে। কৃষিপণ্য বিক্রি ও ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু অগ্রগতির কথা বলা হলেও তার কোনো বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং শেষ মুহূর্তে সফরে যোগ দিলেও, চীনে প্রতিষ্ঠানটির উন্নত ‘এইচ২০০’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চিপ বিক্রির অনুমতি মেলার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

বিরল খনিজ ও তাইওয়ান দেওয়াল
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের জবাবে চীন মার্কিন চিপ ও মহাকাশ শিল্পের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বিরল খনিজ রপ্তানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল, যা এখনো কাটেনি। সফরে ট্রাম্পের সঙ্গী হওয়া মার্কিন বাণিজ্য দূত জেমিসন গ্রিয়ার ব্লুমবার্গ টিভিকে জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে এই বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।

অন্য দিকে, চীনের উপকূল থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরের স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করা বেইজিং এই ইস্যুতে ট্রাম্পকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে। সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি থেকে চীনকে একচুলও নড়ানো যায়নি, যা এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

প্রাপ্তি কেবল সম্পর্কের ‘স্থিতিশীলতা’
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সফরটিকে পুরোপুরি ব্যর্থ বলা চলে না। গত অক্টোবরে দুই নেতার শেষ সাক্ষাতে হওয়া একটি ‘ভঙ্গুর’ বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি অন্তত বহাল রয়েছে। ওই চুক্তির কারণে ট্রাম্প চীনা পণ্যে তিন অঙ্কের শুল্ক স্থগিত রাখেন এবং শি-ও খনিজ সরবরাহে কঠোরতা কমান। যদিও এই চুক্তির মেয়াদ এ বছরই শেষ হচ্ছে। তবে এর ইতিবাচক দিক হলো-দুই দেশ সরাসরি সংলাপ চালিয়ে যেতে রাজি হয়েছে, বড় সংঘাতের ঝুঁকি কমেছে এবং দুই অর্থনীতি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হচ্ছে না- এমন একটি বার্তা ব্যবসায়ী মহলে গেছে। এছাড়া সম্ভাব্য জ্বালানি আমদানি ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ফোরাম গঠনের আলোচনা আগামী দিনের একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। দুই নেতা বড় কোনো চুক্তিতে না পৌঁছালেও শি জিনপিং একে ‘বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক আখ্যা দিয়ে সম্পর্কের স্থিতিশীল ভিত্তি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

ইরান নিয়ে ধৈর্য হারাচ্ছেন ট্রাম্প
এদিকে চীন সফর শেষেই ইরান ইস্যুতে নিজের চরম ক্ষোভ ও অধৈর্য্যের কথা জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ইরান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার পর এবং ইরানি বাহিনী কর্তৃক আরব আমিরাত উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার খবর প্রকাশের পর ট্রাম্প এই হুঁশিয়ারি দেন। শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক শেষে ফক্স নিউজের ‘হ্যানিটি শো’-তে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমি আর বেশি ধৈর্য ধরব না। তাদের দ্রুত একটি চুক্তিতে আসা উচিত।’ ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের গোপন মজুত হস্তান্তরের বিষয়ে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, ‘জনসংযোগ বা প্রচারণার বাইরে কৌশলগতভাবে এটি খুব প্রয়োজনীয় বলে মনে করি না। তবে এটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকলে আমরা স্বস্তি বোধ করব।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com